মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ন

ময়মনসিংহ জিলা স্কুল প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

ময়মনসিংহ জিলা স্কুল প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
ময়মনসিংহ জিলা স্কুল প্রধান শিক্ষক মহসিনা খাতুনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়ম, অসদাচরণ, সরকারি সম্পদের অপচয় ও বিনষ্ট করে উপরন্তু মন্ত্রণালয়ের আদেশকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ। প্রায় ৫ বছর যাবৎ একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে এসব করায় প্রতিষ্ঠানটির একাডিমিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে।

অভিযোগ, করোনা মহামারী সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহসিনা খাতুন শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে সরকার নিষিদ্ধ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের স্মারক নং- ওএম/৯১-সম/২০০৮.২৪৮, তারিখ- ১৮.১১.২০২০, স্মারক নং- ওএম/৯১-সম/২০০৮.২৫১, তারিখ- ২১.১১.২০২০ এর নির্দেশ উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করে সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১৮০০ শিক্ষার্থীর কাছে থেকে (জনপ্রতি ১১৫০ টাকা থেকে ১২৫০/- টাকা) অতিরিক্ত ২০,০০,০০০/- (বিশ লক্ষ টাকা) টাকার বেশী অর্থ আদায় করেন। শুধু তাই নয় উপর্যুক্ত স্মারকে অতিরিক্ত আদায়কৃত অর্থ ফেরত দানের নির্দেশ থাকলেও তিনি তা প্রতিপালন করেননি। এর ফলে তিনি কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করে টাকা আদায় করেন এবং কর্তৃপক্ষের আদেশ থাকা সত্ত্বেও টাকা ফেরতদানের কোন ব্যবস্থা করেন নাই।

এবিষয়ে একটি প্রতিবেদন বেসরকারি সময় টেলিভিশনে প্রচার হলেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গৃহিত হয় নাই। যা সরকার, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের স্মারক নং- ৩৭.০২.০০০.১০১.৯৯.০২০.১৯.২১০২১/১৩, তারিখ- ২৩.০৮.২০২২ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের আদেশ না মানায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা। প্রায় ৫ বছর যাবৎ এই স্কুলে তিনি কর্মরত। বিদ্যালয় মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের নীতি নৈতিকতা শিখানোর মাধ্যমে যা বাস্তবায়িত হয় । অথচ এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিখানো হয় চাঁদাবাজি!
এমনই একটি চাঁদাবাজির দাওয়াত কার্ড গত সপ্তাহে বিভিন্ন দপ্তরে অনেকের হাতে টেবিলে ঘুরে বেরিয়েছে! যা ছিল টক অব দা টাউন। যেই প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা দেশে রাজনীতি, চাকুরী, খেলাধূলা,গবেষণা, ব্যবসায় নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা চাঁদাবাজি করে বেড়াচ্ছে!

২০২১ সালে জনস্বার্থে মহসিনা খাতুনের বদলি আদেশ হলেও তার তদবীরের প্রেক্ষিতে ০৩ বার বদলি আদেশ স্থগিত হয়। যার স্মারক নম্বর ১. মাউশি, স্মারক নং- ৩৭.০২.০০০০.১০৬.০০১.২০.১২০২, তারিখ- ০৫.০১.২০২১, ২। মাউশি স্মারক নং- ৩৭.০২.০০০০.১০৬.১৯.০০১.২০.৫৬, মাউশি স্মারক নং- ৩৭.০২.০০০০.১০৬.১৯.০০১.২০.২০১, তারিখ- ০৮-০২-২০২১। তার খুঁটির জোড় কোথায় ? এমন প্রশ্ন উঠেছে।

বহাল হয়ে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন। তার বদলির আদেশ হওয়ার পর তিনি বিভিন্ন বেসরকারি খাতের অর্থ ব্যাংক থেকে উত্তোলন করেন। করোনাকালীন সময়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রচারও হয়। সেই সংবাদের সাক্ষাৎকারে প্রধান শিক্ষক মহসীনা খাতুন অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করেন। বিষয়টি আত্মস্বীকৃত হওয়ায় অভিযোগ প্রমাণিত বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।

এতকিছুর পরও পারিবারিকভাবে সরকার বিরোধী মনোভাবাপন্ন তার স্বামী বিএনপি’র রাজনীতির সাথে জড়িত। এব্যাপারেও কোনরুপ তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অপরদিকে তার মত একই অভিযোগে গত ১১/১২/২০২২ তারিখে মন্ত্রণালয়ের শৃঙখলা বিষয় শাখা খায়রুল্লা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ এর সাবেক প্রধান শিক্ষক(ভারপ্রাপ্ত) এর বিরুদ্ধে চাকুরী হতে বরখাস্তের অভিযোগনামা গঠন করেছেন। যার স্মারক নম্বর -৩৭.০০.০০০০.০৯৫.২৭.০১৫.২০২২.১১৩ তারিখঃ ১১/১২/২০২২। আরো একজন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যার স্মারক নম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা বিষয়ক শাখা- ৩৭.০০.০০০০.০৯৫.০২৭.০১১.২০২২.৩১, তারিখ- ০২/১০/২০২২।

এই প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ভর্তি কমিটির সদস্য সচিব হিসাবে ভর্তি বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ২০২০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বদলী জনিত ভর্তিতে অভিভাবকের বদলী আদেশের স্মারকের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পত্র প্রেরণ করলে সত্যতা পাওয়া যাবে। বদলী জনিত ভর্তি নীতিমালা বহির্ভূত এবং মোট আসনের অতিরিক্ত ভর্তি করিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। এছাড়াও এমপিও ভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটির ডিজির প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ বাণিজ্যে যুক্ত। যে নিয়োগগুলোতে তিনি নিযুক্ত হন সেগুলোতে মোটা অংকের অর্থ আদায় করে থাকেন।

মাত্র পাঁচ বছরে তার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বেনামে বিপুল পরিমান সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ উঠেছে। যা তার আয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। ময়মনসিংহের সানকিপাড়া শেষ মোড়ে ‘জামালপুর মৈত্রী টাওয়ার’ ২টি রেডি ফ্ল্যাট, যার অনুমানিক মূল্য ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা, নতুন বাজার বিএনপি পার্টি অফিসের সামনে ‘এপেক্স টাওয়ারে’ ১টি ফ্ল্যাটের কাজ চলমান, যার আনুমানিক মূল্য ৭০ লক্ষ, ঢাকার উত্তরায় প্রিয়াংকা রানওয়ে সিটিতে ‘ময়মনসিংহ টাওয়ার’-এ ০১টি ফ্ল্যাটের কাজ চলোমান, যার অনুমানিক মূল্য ১ কোটি টাকা হবে। এছাড়াও ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব মার্কেটে ০১টি দোকান রয়েছে। যার অনুমানিক মূল্য ৫০ লক্ষ।

প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে দুর্ব্যবহার করা তার নিত্যকার ঘটনা। প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তার দুর্ব্যবহারের কারণে আসা যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। ভুক্তভোগী অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের ক্ষতি হবে ভেবে প্রকাশ্যে কিছু বলতে ভয় পায়।

বিদ্যালয়ের সম্পদের অপব্যবহার ও বিনষ্টের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যেমন, প্রধান শিক্ষকের জন্য বিদ্যালয়ের ভিতরে সরকারিভাবে যে বাড়ি ছিল তা পরিত্যক্ত ঘোষনা করে সেখানে উর্ধ্বতন শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময়ে থাকতে দিয়েছিলেন। বিদ্যালয়টির একাডেমিক ভবন, বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি, হোস্টেল বিল্ডিং জীর্ণশীর্ণ, পুকুর পাড় ও বিদ্যালয়ের চারপাশের পরিবেশ সারা বছর নোংরা থাকে। কোন ভিজিট আসলে ঝোপ ঝাড়, ময়লা পরিস্কার করা হয়। ফলে সারা বছরই বিদ্যালয় প্রাঙ্গন ব্যবহারের অনুপযোগী থাকে। অর্থের বিনিময়ে শিক্ষকদের নানা অবৈধ সুবিধা প্রধানের অভিযোগ রয়েছে। যেমন- ছাত্র হোস্টেলে শিক্ষকের পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকার কোন বিধিবিধান না থাকলেও মোঃ তাইজুল ইসলাম নামে একজন শিক্ষককে পরিবার পরিজনসহ থাকতে দিয়েছেন। যা বিধি বর্হিভূত। যদিও হোস্টলে কোন ছাত্র থাকেনা।

একই অপরাধে অতি সম্পতি খিলগাঁও সরকারি ছাত্রাবাসে শিক্ষকদের বসবাসের অভিযোগে অতি সম্প্রতি ঢাকার উপ-পরিচালক মহোদয়কে মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর পত্র দিয়েছেন। যার মাউশি স্মরক নং- ৩৭.০২.০০০০.১০১.৯৯.০৪৯.২০২২.২৯৫০৪, তারিখ- ১৭/১১/২০২২। পরীক্ষা, তদন্ত বা অন্যকোন সরকারি কাজে দায়িত্ব পালনে গমনকারী ব্যক্তিদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।

এতসব আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, অসদাচরণ, সরকারি সম্পদের অপচয় ও অবিনষ্ট, মন্ত্রণালয়ের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে যাওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে কোনরূপ তদন্ত বা ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রশ্ন উঠেছে । এব্যাপারে প্রধান শিক্ষিকা মহসিনা খাতুনের সরকারি মোবাইল নাম্বারে বারবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |